গোপীকৃষ্ণ সামন্ত, কলকাতা : ‘চিঠি দিও, প্রতিদিন অন্তত একটি করে……
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সেই কালজয়ী গানের মতো, ডিজিটাল যুগে এসেও হাতে লেখা চিঠির আবেদন যে ফুরিয়ে যায়নি, তা প্রমাণিত হলো আরো একবার। স্মার্টফোনের নীল পর্দা আর ‘ব্লু টিক’-এর যুগে, যখন মনের কথা হারিয়ে যাচ্ছে ইমোজির ভিড়ে, তখন ৩০ হাজার ফুট উচ্চতায় মেঘের দেশে বসে প্রিয়জনের জন্য চিঠি লিখলেন বিমানের যাত্রীরা।
গত ১২ অক্টোবর জাতীয় ডাক সপ্তাহ উদযাপন এবং ডাকটিকিট সংগ্রহ দিবস উপলক্ষে যোগাযোগ মন্ত্রকের ডাক বিভাগ এবং ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের এক যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত হয়েছিল অভিনব ‘ডিজিটাল ডিটক্স অভিযান’। কলকাতা, বেঙ্গালুরু, দিল্লি, হায়দরাবাদ, মুম্বই ও চেন্নাইয়ের মধ্যে চলাচলকারী নির্বাচিত কয়েকটি উড়ানের যাত্রীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছিল বিশেষভাবে নকশা করা পোস্টকার্ড সহ একটি ‘ডিজিটাল ডিটক্স কিট’। যেখানে, হাতে লিখে প্রিয়জনের উদ্দেশে বার্তা পাঠালেন সকলে।
ক্ষণিকের জন্য হলেও ডিজিটাল দুনিয়ার মায়াজাল থেকে মুক্তি দিয়ে, যাত্রীদের হাতে কলম তুলে দেওয়ার উদ্দেশেই এমন উদ্যোগ বলে জানানো হয়েছে। সেই পোস্টকার্ডগুলিতে কলকাতা থেকে চেন্নাই, দেশের ছয়টি শহরের স্থাপত্য, ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থানগুলির ছবি ফুটে উঠেছিল, যা চিঠির আবেদনকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল।
এমনই এক বিমানে কলকাতা থেকে বেঙ্গালুরুর উদ্দেশে রওনা দেওয়ার উদ্দেশে উঠেছিলেন বর্ধমানের বাসিন্দা রাজীব ধর। বিমানে বসে চিঠি লেখা নিয়ে তিনি বললেন, ‘ইমোজির যুগে আর চিঠি লেখাই হয় না। বিমানে বসে যখন পোস্টকার্ড হাতে নিলাম তখন যেন হঠাৎ করেই ছোটোবেলায় ফিরে গিয়েছিলাম। খুব কাছের একজনকে চিঠি লিখেছি। খুব ভালো উদ্যোগ। এমন অন্যরকম অভিজ্ঞতা সারাজীবন থেকে যাবে।’
বিমান সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, যাত্রীরাও এই উদ্যোগে অভাবনীয় সাড়া দিয়েছেন। মেঘ আর নিস্তব্ধতার মাঝে, যখন চারপাশ শান্ত, তখন তাঁরা নিজেদের মনের কথা কাগজে কলমে ফুটিয়ে তুলেছেন। গন্তব্য বিমানবন্দরে নেমে, ইন্ডিয়া পোস্টের নির্দিষ্ট ডাকবাক্সে সযত্নে জমা করেছেন সেই চিঠি। যা পরবর্তীতে প্রাপকদের ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়া হবে।
অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যাত্রী জানিয়েছেন, নীল টিকচিহ্নের এই যুগে ৩০ হাজার ফুট উচ্চতায় বসে আমি একটি পোস্টকার্ড লিখলাম। মেঘ আর নিস্তব্ধতার মাঝে জীবনের বিশেষ মানুষগুলির জন্য মনের কথা কাগজে কলমে লিখে জানানোর এক অনন্য মুহূর্ত খুঁজে পেয়েছিলাম।
সত্যিই তো, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও যেমন বলেছিলেন, ‘চিঠি তো শুধু কথা নয়, সে যে একটা স্পর্শ।’ এই যান্ত্রিক যুগে, যেখানে সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী, সেখানে হাতে লেখা একটা চিঠি যেন হৃদয়ের উষ্ণ স্পর্শ। এই অভিযানের মাধ্যমে শুধু যে ডিজিটাল নির্ভরতা কমানোর বার্তা দেওয়া হয়েছে তা নয়, বরং মননশীলতা বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক মানবিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এমন অভিনব উদ্যোগ প্রমাণ করল, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার যতই প্রসার ঘটুক না কেন, হাতে লেখা চিঠির স্বতন্ত্র আবেদন ও আবেগগত গুরুত্ব আজও অমলিন।
Subscribe to Updates
Get the latest creative news from FooBar about art, design and business.
Previous Articleনাবিকদের দিশারি এখন পর্যটনের ‘হটস্পট’

