গোপীকৃষ্ণ সামন্ত, শিলিগুড়িঃ সমুদ্রের বুকে ঘুটঘুটে অন্ধকারে নাবিকদের পথ দেখানো লাইটহাউস বা বাতিঘরগুলি হয়ে উঠছে পর্যটনের কেন্দ্রবিন্দু। কেন্দ্রীয় সরকারের বিশেষ উদ্যোগে দেশের লাইটহাউসগুলিকে ঘিরে উন্মোচিত হচ্ছে পর্যটনের এক নয়া দিগন্ত। আর জাতীয় স্তরের এই সফল উদ্যোগকে কাজে লাগিয়ে রাজ্যের উপকূলীয় পর্যটনেও জোয়ার আসার সম্ভবনা জোরালো হয়েছে।
রাজ্যের পরিষদীয় ও পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষের কথায়, ‘নতুন সরকারের আমলে পর্যটন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। আমাদের রাজ্যের সর্বত্রই পর্যটনের বিপুল সম্ভবনা রয়েছে। কেন্দ্রীয় প্রকল্পের অংশ হিসাবে উপকূলবর্তী এলাকায় থাকা বাতিঘরগুলিকেও সাজিয়ে তোলা হবে। আগামীদিনে যা রাজ্য ছাড়াও দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।’
কেন্দ্র সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের লাইটহাউসগুলিতে প্রায় ৪ লক্ষ পর্যটক এসেছিলেন। এক দশকের ব্যবধানে, ২০২৪-২৫ সালে সেই সংখ্যা লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯ লক্ষে। ইতিমধ্যেই ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যগত গুরুত্ব বজায় রেখে দেশের ৭৫টি লাইটহাউসকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। আগামীদিনে আরও ২৫টি লাইটহাউসকে এই প্রকল্পের আওতায় আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের এই ‘লাইটহাউস পর্যটন’ মডেলটি রাজ্যের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। রাজ্যের উপকূলবর্তী জেলা পূর্ব মেদিনীপুরের দড়িয়াপুর, তাজপুর লাইটহাউস এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাগরদ্বীপের লাইটহাউস নিয়ে পর্যটন কেন্দ্রের সম্ভবনা তৈরি হয়েছে।
কাঁথি মহকুমায় অবস্থিত দড়িয়াপুর লাইটহাউসটি ৯৬ ফুট উঁচু। এখানকার একটি প্রধান আকর্ষণ হলো ১৮৮১ সালের একটি পেট্রোল বাষ্প বার্নার, যা গুজরাটের দ্বারকা লাইটহাউস থেকে এখানে আনা হয়েছিল। ২০২৩ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত এই লাইটহাউসে প্রায় আড়াই লক্ষ পর্যটক ভ্রমণ করেছেন। কেন্দ্রীয় প্রকল্পের আওতায় এই বাতিঘরকে সাজিয়ে তোলা হলে পর্যটকের আনাগোনা আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়াও মন্দারমণি এবং শঙ্করপুরের মাঝে অবস্থিত তাজপুর লাইটহাউস পর্যটকদের কাছে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। নতুন করে সাজানো হলে যা পর্যটকদের কাছে আরও বেশি জনপ্রিয়তা পেতে পারে।
অন্যদিকে, ১৮২১ সালে প্রথম নির্মিত সাগরদ্বীপের লাইটহাউসটি ১৯০৯ সালে বর্তমান রূপ পায়। এই লাইটহাউস থেকে সূর্যাস্ত এবং সূর্যোদয়ের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়। পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই লাইটহাউসগুলিকে কেন্দ্র করে একটি ‘হেরিটেজ ট্যুরিজম সার্কিট’ তৈরি করা সম্ভব। দড়িয়াপুর বা সাগরদ্বীপের লাইটহাউসের নিচে সামুদ্রিক জাদুঘর তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে বাংলার প্রাচীন নৌ-বাণিজ্য (যেমন-তাম্রলিপ্ত বন্দরের ইতিহাস) এবং মৎস্যজীবীদের জীবনযাত্রা তুলে ধরা যেতে পারে। যা পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে।
পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে দেশের বিভিন্ন লাইটহাউস চত্বরগুলিকে বিশেষভাবে সাজিয়ে তোলা হচ্ছে। সেখানে বাগান, মুক্তমঞ্চ, শিশুদের খেলার জায়গা এবং ক্যাফেটেরিয়া তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়াও পর্যটকদের সুবিধার জন্য ডিজিটাল টিকিটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রযুক্তিগত দিক থেকেও এসেছে বড় পরিবর্তন— পুরোনো দিনের তেলের বাতির জায়গা নিয়েছে সৌরশক্তিচালিত আধুনিক এলইডি আলো এবং ‘অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম’।
সামুদ্রিক ইতিহাসকে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে চেন্নাই, মহাবলীপুরম, দ্বারকার মতো প্রাচীন বাতিঘরগুলিতে গড়ে তোলা হয়েছে ‘লাইটহাউস জাদুঘর’। গুজরাটের লোথালে ২৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম উচ্চতম লাইটহাউস জাদুঘর। যা ভারতের পাঁচ হাজার বছরের প্রাচীন সামুদ্রিক ঐতিহ্য তুলে ধরবে।
পর্যটনকে আরও আকর্ষণীয় করতে ২০২৩ সালে গোয়ায় শুরু হয় ‘ভারতীয় লাইটহাউস উৎসব’। এরপর ওড়িশার পুরী এবং ২০২৬ সালে বিশাখাপত্তনমেও এই উৎসব পালিত হয়। স্থানীয় শিল্প, উপকূলীয় খাবার, শাস্ত্রীয় ও লোকনৃত্য এবং প্রোজেকশন ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে আলোর প্রদর্শনীর মেলবন্ধনে এই উৎসবগুলি পর্যটকদের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে শুধু সমুদ্র তীরেই নয়, পর্যটনের প্রসারে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরেও ৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪টি অভ্যন্তরীণ জলপথ লাইটহাউস তৈরি হচ্ছে।
গোয়া বা পুরীর ধাঁচে এরাজ্যেও ‘লাইটহাউস উৎসব’-এর আয়োজন করা যেতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। এই উৎসবের মাধ্যমে মেদিনীপুরের বিখ্যাত পটচিত্র, কাঁথির মাদুর শিল্প, সুন্দরবনের মধু এবং সামুদ্রিক মাছের নানা পদের স্টল তৈরি করে স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা সম্ভব। যুক্ত করা যেতে পারে বাংলার নিজস্ব বাউল গান ও লোকনৃত্যকে। লাইটহাউস চত্বরে ইকো-রিসর্ট, মুক্তমঞ্চ এবং ওয়াচটাওয়ার তৈরি করলে তা উইকেন্ড ডেস্টিনেশন হিসেবে পর্যটকদের কাছে আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। এর ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ী, পরিবহণ কর্মী এবং কারুশিল্পীদের কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পেতে পারে।
সবমিলিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে লাইটহাউসগুলি নিঃশব্দে নাবিকদের বিপদ থেকে রক্ষা করেছে, আজ সেগুলিই অর্থনীতি ও পর্যটনের নতুন দিশা দেখাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় ঐতিহ্যকে এই সর্বভারতীয় উদ্যোগের সঙ্গে জুড়ে দিতে পারলে বাংলার পর্যটন শিল্পও যে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছবে, তা বলাই বাহুল্য
Subscribe to Updates
Get the latest creative news from FooBar about art, design and business.
Previous Articleপুজোর বায়না না পেয়ে হতাশ মালদার ঢাকিরা
Next Article ডিজিটাল যুগে ফিরল হাতে লেখা চিঠি

