গোপীকৃষ্ণ সামন্ত, কলকাতা : শারদীয়ার আলোকোজ্জ্বল আবহ, কাঁসরের ধ্বনি আর ঢাকের বাদ্যিতে যখন শহর মেতে উঠেছিল আনন্দোৎসবে, ঠিক তখনই মুহূর্তের মধ্যে নেমে এল নিঝুম অন্ধকার। শোকের ছায়ায় ফিকে হয়ে গেল উৎসবের আমেজ।
উৎসবের আনন্দঘন প্রহরে উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজো মণ্ডপে ঘটে গেল এক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। মণ্ডপে অতিরিক্ত ভিড় ও অব্যবস্থাপনার জেরে আকস্মিক হুড়োহুড়িতে পদপিষ্ট হয়ে শিশু ও নারী সহ মোট ১৯ জন দর্শনার্থীর মৃত্যু হল। গুরুতর আহত হলেন আরও বহু পুণ্যার্থী। আলোয় ঝলমলে পুজো মণ্ডপ মুহূর্তেই পরিণত হল আর্তনাদ আর কান্নার এক ভয়াবহ মৃত্যুফাঁদে।
আনন্দের সপ্তমীতে যে সন্ধ্যা শুরু হয়েছিল উৎসবের উচ্ছ্বাসে, তার পরিণতি হল গভীর শোক আর নীরবতায়। মৃতদের আত্মীয়স্বজনের আকুল কান্নায় ভারী হয়ে উঠল আকাশ-বাতাস। যে মর্ত্যধামে আনন্দময়ী উমা এসেছিলেন দুঃখ-কষ্ট ভুলিয়ে সুখের সওগাত নিয়ে, সেই ধামই মুহূর্তে ঢেকে গেল বিষাদের কালো ছায়ায়। কল্লোলিনী তিলোত্তমার বুকে রক্ত-অশ্রুর এই ক্ষত বয়ে নিয়ে, অঞ্জলির আগেই যেন এক বুক কষ্ট নিয়ে কৈলাসে ফিরে গেলেন মা উমা!
শিলিগুড়ির সূর্যসেন মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা সুতপা সাহা বলছিলেন, ‘এই বিষণ্ণতা থেকে যাবে। কোনও অবস্থাতেই এ ধরনের ঘটনা কাম্য নয়। দর্শনার্থীদের ভিড় সামাল দেওয়ার জন্য প্রথম থেকেই ক্লাব কর্তৃপক্ষকে প্রশাসনের সঙ্গে মিলে আরও বেশি ব্যবস্থা নিতে হত। কিন্তু যে ঘটনা ঘটেছে, তা অপ্রত্যাশিত। এই নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।’
সপ্তমীর বিকেলে আকাশ মেঘলা হয়ে আচমকা বৃষ্টি শুরু হতেই বিপত্তির সূত্রপাত। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে বাইরে থাকা দর্শনার্থীরা তড়িঘড়ি মণ্ডপের ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। অন্যদিকে, ভিতরে থাকা ভিড়ও একই সময়ে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসতে চায়। চোরবাগানের সরু গলি এবং মণ্ডপে প্রবেশ ও বেরোনোর অপ্রশস্ত পথের কারণে সেই মুহূর্তে বিপুল জনস্রোত আটকে পড়ে। হঠাৎ ছড়িয়ে পড়া এক বিভ্রান্তিকর ঘোষণায় আতঙ্কিত হয়ে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েন। শুরু হয় বেপরোয়া ঠেলাঠেলি, যা মুহূর্তের মধ্যেই পদপিষ্টের পরিস্থিতি তৈরি করে।
অপ্রশস্ত গলির কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে অ্যাম্বুল্যান্স ও উদ্ধারকারী গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছতে বেশ বেগ পেতে হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশকর্মী ও স্থানীয়দের তৎপরতায় আশঙ্কাজনক অবস্থায় আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত মেডিক্যাল কলেজ, আরজি কর এবং নিকটবর্তী হাসপাতালগুলিতে নিয়ে যাওয়া হয়। তবুও ১৯ জনকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। মৃতদের মধ্যে যেমন রয়েছে শিশু ও তরুণ-তরুণী, তেমনই রয়েছেন বহু প্রবীণ দর্শনার্থী, যাঁরা পরিবারের সঙ্গে প্রতিমা দর্শনে বেরিয়েছিলেন।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পরই রাজ্য প্রশাসন ও পুজো কমিটির ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। রাজ্য সরকারের তরফে ইতিমধ্যেই মৃতদের পরিবারপিছু ২৫ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য এবং পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসার সমস্ত ব্যবস্থা করেছে প্রশাসন।
নিরাপত্তা ও ভিড় ব্যবস্থাপনায় গাফিলতির অভিযোগে পুজো কমিটির কর্মকর্তা ও আয়োজক সহ মোট ৯ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য হাইকোর্টের এক বিচারপতির নেতৃত্বে বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গঠন করা হয়েছে। কেন এমন ঘটনা ঘটল, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য কেন বিকল্প জরুরি পথ খোলা রাখা হয়নি—তা খতিয়ে দেখছেন কমিটির সদস্যরা।
তবে এই ঘটনার পরেও পরবর্তী দিনগুলিতে সাধারণ মানুষকে উৎসবে শামিল হতে দেখা গিয়েছে। অনেকে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে ছবি তুলেছেন, রিলস তৈরি করেছেন এবং তা নিজেদের সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্টে আপলোডও করেছেন। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক তাপস চট্টোপাধ্যায়।
তাঁর কথায়, ‘চোরবাগানের ঘটনায় রাজ্যের মানুষের মধ্যে কোনও বিষণ্ণতাই লক্ষ করা যায়নি। এত মানুষের প্রাণ গেলেও পুজো নিয়ে মানুষের উন্মাদনা ও রিলস তৈরি বিন্দুমাত্র কমেনি। এই ঘটনার পরেও যেভাবে পুজোর বাকি দিনগুলিতে আমোদ-প্রমোদ দেখা গিয়েছে, তাতে বোঝা যায় রাজ্যের মানুষের মানবিক বোধ কতটা নিচে নেমে গিয়েছে।’
Subscribe to Updates
Get the latest creative news from FooBar about art, design and business.

