নিজস্ব সংবাদদাতা, শিলিগুড়ি:“মালদায় বন্যা হয়েছে জানি, তবে শিলিগুড়িতেও কি বন্যা হয়েছে?”, শিলিগুড়ি টাউন স্টেশনে দাঁড়িয়ে আক্ষেপের সুরে এমনই প্রশ্ন মালদা থেকে আসা এক ঢাকির। দুর্গাপুজোর আনন্দে যখন মেতে উঠেছে গোটা বাংলা, তখন পুজোর মরশুমে দু’পয়সা রোজগারের আশায় শিলিগুড়িতে এসে কার্যত হতাশার দিন গুনছেন বিভিন্ন জেলার ঢাকিরা। কাঁধে ঢাক, চোখে বায়না পাওয়ার আশা, আর মনে সংসার চালানোর দুশ্চিন্তা, এভাবেই কাটছে তাঁদের পুজোর দিনগুলি।

একদিকে মালদায় ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, অন্যদিকে শিলিগুড়িতে মিলছে না পর্যাপ্ত বায়না। সব মিলিয়ে দিশেহারা ঢাকিরা। পুজোর কয়েকটা দিনই তাঁদের কাছে সারা বছরের উপার্জনের অন্যতম বড় ভরসা। এই সময়ে ঢাক বাজিয়ে যা রোজগার হয়, তা দিয়েই সংসারের বহু প্রয়োজন মেটানোর স্বপ্ন দেখেন তাঁরা। কিন্তু এ বছর সেই স্বপ্নপূরণ নিয়েই দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
বয়স্ক ঢাকি সুনীল দাসের কথায়, বন্যায় প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তার উপর যদি এ বছর বায়নাই না মেলে, তাহলে নাতির মুখে হাসি ফোটাবেন কীভাবে? আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, “এবার বায়না না পেলে নাতিকে কী কিনে দেব?”
অন্যদিকে, আজই কালিয়াগঞ্জ থেকে শিলিগুড়িতে এসে পৌঁছেছেন ফুলকুমার রুইদাস। কিন্তু এখানে এসে পরিস্থিতি দেখে তাঁরও মন ভেঙে গিয়েছে। আক্ষেপের সুরে তাঁর বক্তব্য, “না এলেই হয়তো ভালো হত।” কাজের আশায় এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেও যদি খালি হাতে ফিরতে হয়, তাহলে সংসার চলবে কীভাবে—সেই চিন্তাই এখন তাঁদের গ্রাস করছে।
পরিবার-পরিজন, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে পুজোর আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার বদলে উপার্জনের তাগিদে ঘর ছেড়ে দূর শহরে এসে অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাঁদের। তবুও পুরোপুরি আশা হারাননি ঢাকিরা। যদি শেষ মুহূর্তে কোনও পুজো কমিটি তাঁদের ডেকে নেয়, যদি মেলে দু’একটি বায়না, তাহলে হয়তো কিছুটা স্বস্তি ফিরবে সংসারে।
শহরজুড়ে আলোর রোশনাই, মণ্ডপে মণ্ডপে উৎসবের আবহ। ঢাকের তালে যখন দেবী বন্দনায় মেতে উঠেছেন মানুষ, তখন সেই ঢাক বাজানোর অপেক্ষাতেই শিলিগুড়ি টাউন স্টেশনে বসে রয়েছেন একদল শিল্পী। তাঁদের কাছে পুজো মানে শুধু উৎসব নয়, জীবিকা নির্বাহেরও বড় সুযোগ। তাই আনন্দের এই মরশুমেও তাঁদের চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। এখন একটাই অপেক্ষা, কবে মিলবে বায়না, কবে বাজবে ঢাক, আর কবে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর মতো কিছুটা রোজগার নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন তাঁরা?

