পিহু দেবনাথ, শিলিগুড়িঃ শরতের নীল আকাশ, কাশফুলের দোলা, শিউলির সুবাস আর ঢাকের বোলে যে উৎসবের সূচনা হয়েছিল, তারই অবসান ঘটল বিষণ্ণতার সুরে। বাপের বাড়ি ছেড়ে কৈলাসে ফিরলো মা দুর্গা। আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর উৎসবের রেশ মুছে দিয়ে আকাশে যেন নেমে এল বিদায়ের সুর। মহানন্দার জলে প্রতিমা নিরঞ্জনের মধ্য দিয়ে শিলিগুড়ির লালমোহন মৌলিক নিরঞ্জন ঘাটে শেষ হলো দুর্গোৎসবের আরও একটি আবেগঘন অধ্যায়। প্রতিটি মুখে বিষাদের ছায়া, তবু হৃদয়ের গভীরে একটাই প্রার্থনা, আবার এসো মা।
এবারের বিসর্জনে বিশেষ আকর্ষণ ছিল ট্রলিতে চাপিয়ে দুর্গাপ্রতিমা নিয়ে যাওয়ার অভিনব আয়োজন। শিলিগুড়িতে প্রথমবারের এই উদ্যোগ বিসর্জনের দৃশ্যকে এনে দেয় এক ভিন্ন মাত্রা। মায়ের বিদায় যাত্রা দেখতে ঘাটে ভিড় জমান অসংখ্য মানুষ। ঢাকের বাদ্যি, উলুধ্বনি, আর ভক্তদের আবেগে মুখর হয়ে ওঠে বিসর্জন ঘাটের পরিবেশ।
নিরঞ্জনের আগে বিভিন্ন পুজো মণ্ডপে চলে সিঁদুর খেলার পর্ব। লাল সিঁদুরে রাঙা মুখে মহিলারা একে অপরকে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানান। হাসি-আনন্দের মাঝেও বারবার চোখের কোণে জমে ওঠে জল। দেবীকে বরণ করে বিদায় জানানোর সেই চিরাচরিত রীতিতে মিশে থাকে বাঙালির আবেগ, ভালোবাসা আর আগামী বছরের অপেক্ষা।
শিলিগুড়ি পুরনিগম সূত্রে জানা গিয়েছে, ২১ অক্টোবর, বুধবার লালমোহন মৌলিক নিরঞ্জন ঘাটে প্রায় ২৮৬টি প্রতিমা বিসর্জন হয়েছে। পরদিন, ২২ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার আরও প্রায় ৩১টি প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয়। সব মিলিয়ে দু’দিনে প্রায় ৩১৯টি প্রতিমা বিসর্জন হয়েছে। অন্যদিকে পার্বতী নিরঞ্জন ঘাটে বুধবার প্রতিমা নিরঞ্জন হয় ৪৭ টি এবং বৃহস্পতিবার ৬টি।
বিসর্জনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তার দিকেও বিশেষ নজর দেয় প্রশাসন। হিলকার্ট রোড থেকে সেবক মোড় হয়ে লালমোহন মৌলিক নিরঞ্জন ঘাট পর্যন্ত জোরদার করা হয় পুলিশি নিরাপত্তা, যাতে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয় প্রতিমা নিরঞ্জনের পর্ব। উপস্থিত ছিলেন শিলিগুড়ির বিধায়ক তথা পর্যটনমন্ত্রী শংকর ঘোষ। প্রতিমা নিরঞ্জনের ভোর পর্যন্ত তিনি ঘাটে তদারকি করেন।
মহানন্দার জলে একে একে মিলিয়ে গেল প্রতিমার রূপ।বিষণ্ণ হৃদয়ে শহরবাসীর প্রার্থনা, আবার একটি বছর কাটুক মায়ের অপেক্ষায়, আবার ঢাকের বোলে মুখরিত হোক শিলিগুড়ির অলিগলি, আবার উমার আগমনে আলোয় ভরে উঠুক প্রতিটি ঘর। ট্রলিতে চেপে মায়ের বিদায়যাত্রা, ঢাকের বোলে, সিঁদুরের রঙে আর অশ্রুসজল চোখে উমাকে বিদায় জানাল শিলিগুড়ি। ফের এক বছরের অপেক্ষা।

