অরুণ কুমার, জলপাইগুড়িঃ দার্জিলিংয়ের কাঞ্চনজঙ্ঘা, কালিম্পংয়ের পাহাড়ি সৌন্দর্য, তরাইয়ের সবুজ প্রান্তর, ডুয়ার্সের অরণ্য ও চা-বাগান, প্রকৃতি ও বৈচিত্র্যের অসাধারণ সমন্বয়ে উত্তরবঙ্গ দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনভূমি। কিন্তু আগামী দিনের পর্যটন শুধু পাহাড়-জঙ্গল-চা-বাগানের সৌন্দর্য দেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পর্যটকের হাতে পৌঁছে দিতে হবে দ্রুত, নিরাপদ ও স্মার্ট পরিষেবা। পর্যটন প্রশাসনকেও হতে হবে তথ্যনির্ভর ও পরিবেশ-সচেতন। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের বিশ্ব পর্যটন দিবসের সরকারি থিম “Digital Agenda and Artificial Intelligence to Redesign Tourism”। ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস পালিত হবে। এই আন্তর্জাতিক ভাবনাকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গ তথা উত্তরবঙ্গের পর্যটনে গড়ে তোলা যেতে পারে একটি সমন্বিত AI-নির্ভর স্মার্ট ট্যুরিজম মডেল।
‘Smart North Bengal Tourism’ নামে একটি একীভূত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে। দার্জিলিং, কালিম্পং, কার্শিয়াং, মিরিক থেকে শুরু করে জলদাপাড়া, গরুমারা, জয়ন্তী, বিন্দু, ঝালং, লাটাগুড়ি, মূর্তি, মালবাজার ও বক্সা—সব পর্যটনকেন্দ্রের তথ্য থাকবে এক জায়গায়। AI-চালিত ভার্চুয়াল ট্যুরিস্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট পর্যটকের সময়, বাজেট, পছন্দ ও যাতায়াতের মাধ্যম অনুযায়ী ভ্রমণসূচি তৈরি করতে পারবে। বাংলা, ইংরেজি, হিন্দির পাশাপাশি নেপালি-সহ স্থানীয় ভাষায় পরিষেবা চালু হলে তা আরও কার্যকর হবে।
কোথায় যাবেন, কী দেখবেন, কোথায় থাকবেন, কোথায় খাবেন, রাস্তার অবস্থা কেমন—এসব প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তর দিতে পারে AI চ্যাটবট। পর্যটক কোনও স্থানের ছবি দিলে AI তার পরিচয়, ইতিহাস ও গুরুত্ব জানাতে পারে। QR Code ও Augmented Reality-এর মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী ভবন, চা-বাগান, বনাঞ্চল ও স্থানীয় সংস্কৃতির তথ্যও তুলে ধরা সম্ভব।
এটি গাইডের বিকল্প নয়; বরং স্থানীয় গাইডদের আরও তথ্যসমৃদ্ধ করে তুলতে পারে।
উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি পর্যটনে অতিবৃষ্টি, ভূমিধস, কুয়াশা বা রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়া বড় সমস্যা। পর্যটন দফতর, আবহাওয়া, প্রশাসন ও সড়ক সংস্থার তথ্য একত্র করে AI-ভিত্তিক Tourist Safety Alert System তৈরি করা যেতে পারে। পর্যটকের মোবাইলে আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে যাবে। একইভাবে AI বিশ্লেষণ করে কোথায় কখন পর্যটকের চাপ বাড়তে পারে তা জানানো সম্ভব। জনপ্রিয় গন্তব্যে অতিরিক্ত ভিড় হলে কাছাকাছি বিকল্প পর্যটনকেন্দ্রের পরামর্শ দেওয়া যাবে। এতে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত গ্রাম ও প্রকৃতিনির্ভর এলাকাগুলিও পর্যটনের মানচিত্রে উঠে আসবে।
ডুয়ার্সে AI-র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হতে পারে পরিবেশ সংরক্ষণে। পর্যটকের সংখ্যা, যানবাহন, বর্জ্য, জল ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য বিশ্লেষণ করে Tourism Sustainability Dashboard তৈরি করা যেতে পারে। কোন এলাকায় পরিবেশগত চাপ বাড়ছে, কোথায় বর্জ্য বেশি হচ্ছে—AI সেই তথ্যের ভিত্তিতে প্রশাসনকে আগাম সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। অর্থাৎ AI শুধু পর্যটক বাড়ানোর প্রযুক্তি নয়, প্রকৃতি রক্ষারও হাতিয়ার হতে পারে।
উত্তরবঙ্গের চা-বাগানকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে ‘Digital Tea Tourism’। QR Code স্ক্যান করলেই পর্যটক জানতে পারবেন বাগানের ইতিহাস, চা তৈরির পদ্ধতি, শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও স্থানীয় সংস্কৃতির কথা। AI পর্যটকের পছন্দ অনুযায়ী Tea Trail সাজিয়ে দিতে পারে।অন্যদিকে, স্বীকৃত হোমস্টেগুলিকে একই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করে সরাসরি বুকিং, পেমেন্ট, রিভিউ, স্থানীয় খাবার, গাইড ও পরিবহণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে পর্যটনের অর্থ সরাসরি স্থানীয় মানুষের হাতে পৌঁছবে।
স্থানীয় যুবকদের জন্য চালু করা যেতে পারে AI Tourism Guide Training Programme। AI ব্যবহার, ডিজিটাল মার্কেটিং, অনলাইন বুকিং, বহুভাষিক যোগাযোগ, ফটোগ্রাফি, ভিডিও নির্মাণ, সাইবার নিরাপত্তা ও পর্যটক ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। গাইড, হোমস্টে মালিক, গাড়িচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে যুক্ত করলে ডিজিটাল পর্যটন সরাসরি কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হবে। পাহাড় ও জঙ্গলে নেটওয়ার্ক সমস্যা থাকায় অ্যাপে offline maps, emergency contacts, safety zones ও জরুরি তথ্য রাখাও জরুরি। AI-নির্ভর পর্যটনে ব্যক্তিগত তথ্য, অবস্থান, পেমেন্ট ও ভ্রমণ-তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। AI যেন ভুল তথ্য না দেয়, তার জন্য সরকারি যাচাই করা তথ্যভাণ্ডারের ওপর পরিষেবা তৈরি করা জরুরি। প্রযুক্তি যেন স্থানীয় সংস্কৃতি ও মানুষের জায়গা দখল না করে, বরং তাঁদের দক্ষতা ও আয় বাড়ায়—সেদিকেও নজর রাখতে হবে। শেষ পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের পর্যটনের সাফল্য শুধু কতজন পর্যটক এলেন, সেই সংখ্যায় মাপা উচিত নয়। কত কর্মসংস্থান তৈরি হল, কত অর্থ স্থানীয় অর্থনীতিতে থাকল, কতটা প্রকৃতি রক্ষা হল এবং পর্যটকের অভিজ্ঞতা কতটা উন্নত হল—এসবও হতে হবে সাফল্যের মাপকাঠি।
২০২৬-এর বিশ্ব পর্যটন দিবসের থিম তাই উত্তরবঙ্গের জন্য শুধু একটি আন্তর্জাতিক স্লোগান নয়; এটি হতে পারে নতুন পর্যটন-দর্শনের রূপরেখা। পাহাড় থাকবে পাহাড়ের মতো, জঙ্গল থাকবে জঙ্গলের মতো, চা-বাগান থাকবে তার ঐতিহ্যে—কিন্তু পর্যটন পরিষেবা হবে আরও আধুনিক, নিরাপদ, তথ্যনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব। AI-কে যদি প্রচারের হাতিয়ার না বানিয়ে পরিকল্পনা, নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় কর্মসংস্থান ও পর্যটকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবে দার্জিলিং থেকে ডুয়ার্স, সমগ্র উত্তরবঙ্গ হয়ে উঠতে পারে ভারতের একটি শক্তিশালী ডিজিটাল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই পর্যটন অঞ্চল। পরিশেষে এ কথাই বলা যেতে পারে আন্তর্জাতিক পর্যটন দিবস উপলক্ষে সময় এসেছে এখনই সময় সিদ্ধান্তের।
AI আসুক উত্তরবঙ্গের পর্যটনে, কিন্তু প্রকৃতিকে বিসর্জন দিয়ে নয়। পাহাড়, নদী, বন, চা-বাগান ও মানুষের জীবন, সবকিছুকে সঙ্গে নিয়েই হোক উন্নয়ন। প্রযুক্তি আমাদের পথ দেখাক, প্রকৃতি আমাদের সীমা শেখাক। পর্যটক, প্রশাসন ও স্থানীয় মানুষ একসঙ্গে এগোলেই উত্তরবঙ্গের পর্যটন হবে সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও টেকসই।

