মোহন কর্মকার, শিলিগুড়ি : পুজোর মরশুমে পাহাড়ে বেড়ানোর প্রস্তুতি যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই ফের বড় ধাক্কা ১০ নম্বর জাতীয় সড়কে। টানা বৃষ্টিতে সিকিমের বারদাংয়ের ২০ মাইল এলাকায় পাহাড় থেকে পাথর ও মাটি নেমে এসে রাস্তার উপর জমেছে। কোথাও কাদায় পিচ্ছিল রাস্তা, কোথাও আবার পাহাড়ের ঢাল থেকে গড়িয়ে আসছে ছোট-বড় পাথর। ফলে বাংলা থেকে সিকিমের অন্যতম প্রধান যোগাযোগপথে তৈরি হয়েছে নতুন করে অনিশ্চয়তা। আর এই অনিশ্চয়তার সবচেয়ে বড় ছায়া পড়েছে পুজোর পর্যটনে।
শরৎ-তের ছুটি মানেই বাঙালির পাহাড়মুখী হওয়া। পুজোর কয়েক মাস আগে থেকেই সিকিম, দার্জিলিং, কালিম্পং, লাভা, লোলেগাঁও কিংবা পাহাড়ের অন্য গন্তব্যগুলিতে হোটেল বুকিং শুরু হয়ে যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু পুজোর ঠিক আগেই ১০ নম্বর জাতীয় সড়কে ফের ধসের ঘটনায় পর্যটনে ফের নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, নির্ধারিত সময়ে রাস্তা আদৌ নিরাপদ থাকবে তো?
শনিবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সেবক থেকে রংপো পর্যন্ত প্রায় ৫২.১ কিলোমিটার রাস্তায় সমস্ত ধরনের যান চলাচল বন্ধ রেখেছিল প্রশাসন। ভারী বৃষ্টিতে ধস, পাথর পড়া এবং রাস্তার ক্ষতির আশঙ্কা থেকেই এই সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ, যে রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন উত্তরবঙ্গ থেকে সিকিমের দিকে ছুটে যায় পর্যটকদের গাড়ি, সেই পথেই এখন প্রকৃতিই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় বাধা।
১০নন্বর জাতীয় সড়ক উত্তরবঙ্গ ও সিকিমের পর্যটনের অন্যতম প্রধান ভরসা। পর্যটকদের বড় অংশই শিলিগুড়ি হয়ে এই পথ ধরে সিকিমে পৌঁছন। ফলে রাস্তা বন্ধ হওয়া মানেই শুধু যাতায়াতে সমস্যা নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে যায় হোটেল, গাড়ি, রেস্তরাঁ, পর্যটন সংস্থা থেকে শুরু করে পাহাড়ের অসংখ্য ছোট ব্যবসার স্বার্থ।
এই অবস্থায় পর্যটন ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, বারবার ধস নামার কারণে পর্যটকদের ঘুরপথে যেতে হলে বাড়তে পারে যাত্রার সময়। বাড়তে পারে গাড়িভাড়াও। এক দিনের সফর দীর্ঘ হয়ে যেতে পারে কয়েক ঘণ্টা। গন্তব্যে পৌঁছনোর অনিশ্চয়তা তৈরি হলে শেষ মুহূর্তে কেউ কেউ সফর পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে পারেন। আর পর্যটকের সংখ্যা কমলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে পাহাড়ের পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে। পর্যটন ব্যাবসায়ী সম্রাট স্যার্নাল বলেন, “পাহাড়ে পুজোর মুখে পর্যটন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। আশা করছি তার আগেই ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক সংস্কার করা হবে। তবে, শিলিগুড়ি সিকিম বিকল্প রাস্তা তৈরীর ব্যাপারে কেন্দ্রকে উদ্যোগী হতে হবে”।
\পর্যটন ব্যবসায়ীদের কাছে রাস্তা বন্ধ থাকার থেকেও বড় সমস্যা হল অনিশ্চয়তা। রাস্তা খুললেও ফের বৃষ্টি হলে আগামীতে কী হবে, তা নিয়েই চিন্তিত তারা। পাহাড়ি রাস্তায় ধসের চরিত্রও এমন, একটি অংশ পরিষ্কার করার পর অন্য কোনও জায়গায় নতুন করে সমস্যা দেখা দিতে পারে। ফলে পর্যটক, গাড়িচালক এবং পর্যটন ব্যবসা, সব পক্ষকেই পরিস্থিতির দিকে নজর রাখতে হচ্ছে।
পুজোর সময়ে বহু পর্যটক পরিবার নিয়ে পাহাড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। রাস্তার উপর পাথর পড়া কিংবা আচমকা ধস নামার খবর স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বাড়ায়। ফলে রাস্তা দ্রুত পরিষ্কার হওয়ার পাশাপাশি যাতায়াতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এবার পর্যটনের ক্ষেত্রে প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
পুজোর মুখে পাহাড়ি বাকে পর্যটকের গাড়ি না চললে চালকের যেমন আয় কমে, তেমনি বুকিং বাতিল হলে হোটেল থেকে রেস্তরাঁ ও স্থানীয় দোকানেও তার যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। চলতি বছরে ১০ নম্বর জাতীয় সড়কে একাধিকবার ধস ও রাস্তার ক্ষতির কারণে ইতিমধ্যে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। ফলে পর্যটন মহলে বারবার প্রশ্ন উঠছে পুজোর মতো গুরুত্বপূর্ণ মরশুমে এই রাস্তাকে কতটা নিরাপদ রাখা সম্ভব হবে? বৃষ্টি কমলে রাস্তা পরিষ্কার করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হলেও বৃষ্টি ফের বাড়লে নতুন করে ধসের আশঙ্কাও থেকে যাবে।
রাজ্যের পর্যটন মন্ত্রী শংকর ঘোষ বলেন, “এই মূহুর্তে পাহাড়ে পর্যটকের সং্খ্যা কম। বিশেষ করে এই সময় পাহাড়ে ভয় থাকে। সেকারনে স্থানীয়দের ও পর্যটকদের সতর্ক থাকতে হবে। তবে ভূমিধস নিয়ে বৃহত্তর পরিকল্পনা নেওয়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রীকে জানাবো।”
পুজোর আর বেশি দেরি নেই। হোটেলের ঘর বুক করা, ব্যাগ গোছানো, পাহাড়ে কয়েকটা দিন কাটানোর স্বপ্ন, সবই প্রস্তুত। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে ধস। পাহাড়ে পর্যটনের দরজা খোলা থাকবে, নাকি বারবার ধস এসে সেই দরজায় তালা ঝুলিয়ে দেবে তার উত্তর আপাতত লুকিয়ে রয়েছে পাহাড়ের আবহাওয়ার মধ্যেই।

