ভাস্কর বাগচী, শিলিগুড়ি : সিঁড়ি ভাঙার দিন শেষ। এবার মুহূর্তেই পাহাড়চূড়ায় পৌঁছে সরাসরি দেবীমূর্তির সামনে হাজির হওয়ার সুযোগ! কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সেবকেশ্বরী কালীমন্দিরে দর্শনার্থীদের জন্য এমনই আধুনিক পরিষেবা চালু হতে চলেছে। পাহাড়ের খাড়া পথ পেরিয়ে মন্দিরে ওঠার কষ্ট কমানোর পাশাপাশি গোটা মন্দির চত্বরকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে ইতিমধ্যেই পূর্ত দপ্তরের একটি বিশেষ দল মন্দির পরিদর্শনের পাশাপাশি কোথায় কী করা হবে, তার রূপরেখা তৈরি করেছে। দলটি কয়েক দফায় পরিকল্পনা নিয়ে বৈঠক করেছে মন্দির কমিটির সঙ্গে।
কিন্তু কেন হঠাৎ নজর সেবক কালীমন্দিরে? পর্যটন মন্ত্রক সূত্রে খবর, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইচ্ছেকে মর্যাদা দিয়েই সমস্ত কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কোনও একটি মাধ্যমে সেবকেশ্বরী কালীমন্দিরের ঐতিহাসিক পেক্ষাপট জানার পরই, মন্দিরটি নিয়ে কেন্দ্রীয় পর্যটনমন্ত্রীর কাছে নিজের ইচ্ছে প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। পর্যটনমন্ত্রী নতুন করে মন্দিরটি গড়ে তোলার নির্দেশ দেন কেন্দ্রীয় পূর্ত মন্ত্রককে। তারপরই শুরু হয়ে যায় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ‘সিড়ি ভাঙা’। পরিকল্পনায় রয়েছে কালীমন্দির সংলগ্ন এলাকায় ভারত পর্বতমালা প্রকল্পে রোপওয়ে পরিষেবা চালু করার বিষয়টিও।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে মন্দিরে লিফট বসানো হবে। এর জন্য মন্দিরের পিছনে থাকা একটি জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে। বয়স্ক মানুষ, শিশু, বিশেষভাবে সক্ষম দর্শনার্থী এবং শারীরিকভাবে অসুবিধায় থাকা পুণ্যার্থীদের জন্য মন্দিরে পৌঁছনো অনেকটাই সহজ হবে লিফট পরিষেবা চালু হলে। এতদিন দীর্ঘ সিঁড়ি বেয়ে মন্দিরে উঠতে গিয়ে অনেককেই সমস্যায় পড়তে হত। লিফট চালু হলে সেই দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে বলে মনে করা হচ্ছে। রোপওয়ের জন্য দেখা হয়েছে শিবমন্দির সংলগ্ন একটি এলাকা। ইতিমধ্যেই বিকল্প করোনেশন সেতু তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে যদি তিস্তার ওপর রোপওয়ে পরিষেবা চালু হয়, তবে সেবক নতুন ভাবে পর্যটন মানচিত্রে আলাদা জায়গা খুঁজে নেবে বলে মনে করা হচ্ছে।
শুধু লিফট বা রোপওয়ে নয়, মন্দিরের পরিকাঠামোয় আমূল পরিবর্তনের পরিকল্পনাও রয়েছে। দর্শনার্থীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে অত্যাধুনিক শৌচালয়, বসার জায়গা-সহ একাধিক পরিষেবা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। মন্দিরের গর্ভগৃহেও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ রয়েছে। ফলে ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি মন্দিরটি পর্যটকদের কাছেও আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। তবে মন্দিরের কাঠামো বা আদলের কোনও পরিবর্তন করা হবে না বলে পূর্ত দপ্তর সূত্রে খবর। মন্দির কমিটির সম্পাদক সুব্রত সাহা বলেন, ‘কয়েক দফায় পূর্ত দপ্তরের আধিকারিকরা মন্দিরে এসেছিলেন। আমাদের সঙ্গে তাঁদের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। সমস্ত কিছুই আমাদের ইতিবাচক মনে হয়েছে। আশা করছি কালীপুজোর পর লিফট সহ পর্যায়ক্রমে সমস্ত কাজ শুরু হয়ে যাবে।’
বছরের প্রত্যেকদিনই সেবকে পর্যটকদের ভিড় জমে। পর্যটন মহলের মতে, কোনও ধর্মীয় স্থানকে ঘিরে উন্নত পরিকাঠামো তৈরি হলে সেখানে শুধু স্থানীয় পুণ্যার্থীরাই নন, বাইরের জেলা ও রাজ্য থেকেও পর্যটকদের আনাগোনা বাড়তে পারে। বিশেষ করে পাহাড়ি পরিবেশে অবস্থিত মন্দিরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ধর্মীয় আবহ এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধার সমন্বয় পর্যটকদের কাছে নতুন আকর্ষণ তৈরি করতে পারে। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাড়তে পারে স্থানীয় দোকান, খাবারের ব্যবসা, পরিবহণ এবং অন্যান্য পরিষেবার চাহিদা। তবে আধুনিকীকরণের সঙ্গে মন্দিরের ঐতিহ্য ও ধর্মীয় পরিবেশ যাতে অক্ষুণ্ণ থাকে, সেদিকেও নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সেবকেশ্বরী কালীমন্দির শুধু পুণ্যার্থীদের দর্শনস্থল নয়, পর্যটনের মানচিত্রেও আরও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিতে পারে। পাহাড়চূড়ায় দেবীদর্শনের সেই যাত্রায় তখন আর প্রধান বাধা হবে না দীর্ঘ সিঁড়ি।
Subscribe to Updates
Get the latest creative news from FooBar about art, design and business.

