শিলিগুড়ি: গরু চোর সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনায় এক ব্যক্তির মৃত্যুর অভিযোগ ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়াল শিলিগুড়ি মাটিগাড়া ও বাগডোগরা থানা এলাকায়। অভিযোগ, সন্দেহভাজন একটি গাড়িকে ঘিরে ধরে প্রথমে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় উত্তেজিত জনতা। পরে গাড়িতে থাকা ব্যক্তিদের উপর চড়াও হয়ে মারধর করা হয়। সেই হামলাতেই এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ। গুরুতর জখম আরও এক ব্যক্তি বর্তমানে হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন। একইসঙ্গে সন্দেহভাজনদের ব্যবহৃত দুটি গাড়িতে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

ঘটনার সূত্রপাত মাটিগাড়া থানার অন্তর্গত তারাবাড়ি এলাকার বালাসন নদীর ধারে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার ভোররাতে ওই এলাকায় একটি সন্দেহজনক গাড়ি ঘোরাফেরা করতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সম্প্রতি শিলিগুড়ি শহর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় রাতের অন্ধকারে গবাদি পশু চুরির একাধিক অভিযোগ সামনে আসায় স্থানীয়দের মধ্যে আগে থেকেই ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছিল। সেই পরিস্থিতিতে ভোররাতে অপরিচিত একটি গাড়ি দেখতে পেয়েই স্থানীয়দের একাংশের মধ্যে গরু চোর সন্দেহ তৈরি হয়।
এরপর দ্রুত ঘটনাস্থলে বহু মানুষ জড়ো হয়ে যান। অভিযোগ, উত্তেজিত জনতা গাড়িটিকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং লাঠিসোটা নিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর শুরু করে। গাড়ির ভিতরে থাকা ব্যক্তিদেরও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অভিযোগ, গণপিটুনির পর এক ব্যক্তিকে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। ঘটনায় আরও এক ব্যক্তি গুরুতর জখম হন। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গিয়েছে। ঘটনাস্থলে থাকা আরও কয়েকজন ব্যক্তি পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে পালিয়ে যায় বলেও স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, তারাবাড়ি এলাকায় সন্দেহভাজনদের ব্যবহৃত দুটি গাড়িতেও ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। পরে ওই গাড়িগুলিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় মাটিগাড়া ও বাগডোগরা থানার পুলিশ। পুলিশের তৎপরতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। ঘটনার পর এলাকায় পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বেশ কিছুদিন ধরেই শিলিগুড়ি শহর ও সংলগ্ন এলাকায় রাতের অন্ধকারে রাস্তা বা আশপাশের এলাকা থেকে গবাদি পশু চুরি করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠছে। কখনও নকশালবাড়ি, কখনও বাগডোগরা, কখনও মাটিগাড়া, আবার কখনও শিলিগুড়ির বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে বলে স্থানীয়দের দাবি। দামি গাড়ি নিয়ে এসে রাতের অন্ধকারে গবাদি পশু তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে বহু এলাকায় আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
তবে তারাবাড়ির ঘটনায় যাঁদের উপর হামলা চালানো হয়েছে, তাঁরা আদৌ গবাদি পশু চুরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ভোররাতে তাঁরা কেন ওই এলাকায় এসেছিলেন এবং তাঁদের সঙ্গে থাকা গাড়িগুলির সঙ্গে গবাদি পশু চুরির কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ। অন্যদিকে, মৃত ও আহত ব্যক্তিদের পরিচয় জানার চেষ্টা শুরু করেছে পুলিশ। সেই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। গণপিটুনি, অগ্নিসংযোগ এবং ভাঙচুরের ঘটনায় কারা সরাসরি জড়িত ছিল, তাঁদের চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছে পুলিশ।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনায় জড়িত কাউকেই রেয়াত করা হবে না। অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি, এলাকায় গবাদি পশু চুরির যে অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে উঠছে, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার পর তারাবাড়ি ও বালাসন নদী সংলগ্ন এলাকায় উত্তেজনা রয়েছে। একদিকে গবাদি পশু চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের ক্ষোভ, অন্যদিকে সেই সন্দেহের ভিত্তিতে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে গণপিটুনি ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ, দুই ঘটনাকে ঘিরেই এলাকায় নতুন করে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

